দাবদাহ গল্প – সাহেব আর স্বপ্ন তুলি মুখার্জি চক্রবর্তী

দাবদাহ গল্প – সাহেব আর স্বপ্ন
তুলি মুখার্জি চক্রবর্তী


১৮/৪/২৩
‘ন্যাড়াদেউলের বট-অশ্বথের নীচে আগামী কাল সন্ধ্যায় মিটিং ডাকা হয়েছেএএএএ, এই বছর উত্তরোত্তর তাপমাত্রা বৃদ্ধি কে রুখতে পরিকল্পনা নেওয়া হবেএএএএএ। এতদ্বারা গ্রামের সকলকে দাবদাহ রোধক নিজ নিজ উদ্ভাবনী চিন্তা সহ সন্ধ্যা সাত ঘটিকায় হাজির হতে আজ্ঞা দিয়েছে মোড়ওওওওল।’ ভোর ভোর ঢাক পিটিয়ে গ্রামে জানান দিচ্ছে বংশী ঢ্যাঁড়াওয়ালা। ধানক্ষেতের আলপথ বা মাঠের সরু পথ, বংশী যেখান দিয়ে চলে, তার পিছনে পিছনে চলে কিছু আধা ন্যাংটা বাচ্চা আর এর ওর বাড়ির এঁটো কাঁটা খাওয়া লিকলিকে নেড়ি গুলো। এই পিছু চলার সংখ্যা বাড়তেই থাকে। বংশী ঢাকে বাড়ি মারলেই বাচ্চা গুলো মুখে হাত দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ করে হেসে গড়ায় আর নেড়ি গুলো ভৌ ভৌ। প্রস্তাব কে সমর্থন করার আর গণপূর্তি সংখ্যা রক্ষার অলিখিত অঘোষিত দায় যেন ওদের। ঝাঁঝা পোড়া গরম বাড়ার আগে সবাই যে যার কাজ সারছে আর ঘোষণা শুনছে। সন্ধ্যায় হাজির হতেই হবে ‘মিটিনে’ । কেউ কেউ আবার ভাবছে এই ‘মিডিং’ এ ঠিক কি বলতে হবে… আচ্ছা গিয়ে ই দেখা যাক কে কি বুদ্ধি নিয়ে আসে। সন্ধ্যা সাতটা হয় হয়… টাকমাথা রোগা পটকা চেহারা মোড়ল ঘাম মুছতে মুছতে আসন নিলেন। কেউকেটা সকলেরই আসা শুরু। গাছ বাঁধানো চত্বর থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তে পর্যবেক্ষণ চলছে। আফিমখোর বুড়ো বিশু ঢাউস টুপি মাথায় দিয়ে এসেছে। মাথার ভেতর কিলবিল করা আইডিয়া গুলো যদি উবে যায় এই ভয়ে। আজ তো বলতেই হবে তাকে। রহিম চাচা পায়ের ব্যথায় হাঁটাচলা করে কষ্টে। আজ লাঠি আর নাতির ঘাড়ে ভর দিয়ে এসেছে। পড়ে গেলে যদি আইডিয়া পালায়, তাই। একটা ভালো বুদ্ধি দিতেই হবে যে আজ। প্রমীলা দিদিও এসেছে। তার অভিজ্ঞতা অনেক। বয়স একশ ছুঁই ছুঁই কিন্তু চলতে পারে বসে বসে। এ গ্রামে তাকে সবাই ‘ব্রিটিশ বুড়ি’ বলে আড়ালে। সাহেব শাসন নিজের চোখে দেখা আর সেই সময়ের গল্প বলেন এখনও। যদিও কেউ শোনে না আর। আজ তিনি শোনাবেন তার আইডিয়া এই আশায়। গ্রামের অনেক বাড়ির গোরু দোয় কিষাণ। আদতে বিহারী। সেও কিছু বলবে তার খিচুড়ি ভাষায়। গোরুর বাইরে কিছু বলার সুযোগ ছাড়া যায় না। এমন অনেকেই অনেক অনেক বুদ্ধি নিয়ে হাজির। শুরু হলো সভা। মোড়ল তার সরু শরীরে মোটা ভাষণ দিয়ে এই এক করে সবাই কে নিজ নিজ বুদ্ধি বলতে বললেন দাবদাহ রোধ করার। কেউ বলে জলে ভিজিয়ে দেওয়া হোক গ্রামের মাটি কিন্তু জল কৈ? পুকুর নদী সব শুকনো তাই বাতিল। কারও মত ছাতার মতো কালো কাপড় দিয়ে পুরো গ্রামের মাথা ঢেকে দেওয়া যাতে সূর্য ঢুকতেই না পারে। কিন্তু এত কাপড় কৈ? অতএব বাতিল। বুড়ো বিশু মাঝে মাঝে চোখ খুলে ভুউউউউ করে শব্দ করছে আর ঢুলছে। তার মত অমত কিছুই বোঝা যাচ্ছে না ঐ শব্দে। সবাই যে যার নিজের মত কে সেরা সাব্যস্ত করতে গিয়ে বেধে গেল গোল। সে এক অরাজক অবস্থা। দূর থেকে সব দেখছিল শুনছিল বারো বছরের সাহেব। বড় বড় লোকেদের এই অবস্থা দেখে সে যেই না প্রতিবাদ করে সবাই কে চুউউউউপ করতে বলবে ভাবছে এমন সময় কে যেন দিল এক ধাক্কা। চমকে উঠে দ্যাখে মা দাঁড়িয়ে বিছানার পাশে। ‘ও বাবা অত হাত পা ছুঁড়ো না। পড়ে যাবে বিছানা থেকে সোনা, মালতী কে খড় বিচুলি দিতে হবে তো। ওঠ বাবা ঘুম থেকে’ মায়ের কথায় স্বপ্ন থেকে একদম ঘরে চলে আসে সাহেব। নরম আলো আমগাছের ডাল পাতার ফাঁক দিয়ে অবাধে চলে এসেছে পূবের জানলা দিয়ে ঘরে। গরম নেই ত্যামন। আড়মোড়া ভেঙে নিমের দাঁতন নিতে ঘর ছাড়ে সে স্বপ্নের কথা ভেবে মুচকি হেসে। এবার স্কুল ম্যাগাজিনে এই গল্প টাই লিখবে সাহেব। তার আগে কাউকে বলবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *