সৎমা নয় ডাইনী–কবি সৈয়দ হোসেন

রাক্ষস-খোক্কস একটি রূপকথা। আবহমানকাল থেকে রাক্ষস-খোক্কস এর কিচ্ছা শুনিয়ে গল্প শুনিয়ে ভয় দেখিয়ে ঘুম পারাতেন নানী দাদীরা। পাতালপুরের আকাশদ্বীপে রাক্ষসীদের বাস। ডাইনীদের রক্তমাখা কালীর জিহ্বা, লালচক্ষু, বিকট চেহেরা, অদ্ভুত তার মুখ সামনে যা পাই গালপুরে খাই আগুনেরমত মুখ। না খেয়ে কান্না করলে, দুষ্টমি করলে, না ঘুমালে রাক্ষসী, ডাইনীরা পাতালপুর হতে এসে ঘাড় মটকে দেয়, রক্ত চুষে খায়। এক লোকমায় খেয়ে ফেলে সব, খা খা জলদি খা, জলদি ঘুমা! সে ভয় আমাদের মনে স্থায়ী হয়ে রয়ে যায় যতক্ষণ না এ বিষয়টি আমাদের কাছে পরিস্কার হয়। সে থেকে আমরা রাক্ষস-খোক্কস বলতেই ভয় পাই। হয়তো ভাবছেন হঠাৎ করে রাক্ষস-খোক্কস কেন, বলছি- ডাইনী/রাক্ষসী শব্দটি আমার পছন্দ এবং কেন?
এ সমাজে বিরাজমান একটি জ্যান্ত ডাইনী/রাক্ষসীর সাথে আপনাদের পরিচয় করে দিবো। আমাদের সমাজে বহুবিবাহের প্রচলন রয়েছে।বহুবিবাহ সামাজিক সমস্যা নয় বরং যথেষ্ঠ পরিশুদ্ধতা এনে দেয়। স্ত্রীগণ হয় পরস্পরের সতীন। সতীন শব্দটির আবিষ্কার করতে পারি খৃষ্টপূর্ব ১৬২০-২৫ এর কাছাকাছি সময়ে , বিবি সারা(রা:) ও বিবি হাজেরা (রা:) থেকে। সতীন শব্দের ভাবার্থ থেকে আমরা সয়ংক্রীয়ভাবে বুঝি হিংসা প্রতিহিংসার ক্রুক্ষেত্র নিজ নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং ঝগড়ার একটা পূর্বাস। সতীনে সতীনে সাপে নেউলে সম্পর্ক। স্ত্রী মারা গেলে শিশু সন্তানদের দেখাশোনা করার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করে সন্তানদের সামনে সৎমা হাজির করা। বিপত্নীক পুরুষটি একটি নারীদেহের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে। কোন কোন সময় বিপত্নীক পুরুষটি তার অভিপ্রায় নিকটজনদের কাছে ব্যক্ত করে থাকে কিংবা আত্মীয়স্বজন বা সমাজের লোকজন বাবাটিকে বুঝিয়ে দ্বিতীয় বিবাহে প্রলুদ্ধ করে। এক্ষেত্রে পুরুষটির মনের সুপ্ত বাসনাও চরিতার্থ হয়। সে বুঝে উঠতে পারেনা সন্তানদের জন্য কি ক্ষতি করলো। সরল পুরুষটিও একদিন বাধ্য হয়ে জ্যান্ত রাক্ষস হয়ে উঠে। এ রাক্ষসী তৈরি করে পুরুষ নামের রাক্ষস।
সম্ভবত এ সতীন থেকে সৎ নিয়ে মায়ের সতীনের সাথে জুড়ে দিয়ে সৎমা নামে একটি ভয়ংকর জাতির জন্ম। সৎমা স্বামীর, সৎসন্তান তার বাবার সম্পদের উত্তরাধিকারী কিন্তু সৎমা সৎসন্তানের এবং সৎসন্তান সৎমা ও সৎবাবার {আপন মা অন্যত্র বিয়ে করা স্বামী} সম্পদের উত্তরাধিকারী নয়। সৎসন্তান আর সৎমায়ের সম্পর্ক দা কুমড়ার সম্পর্কের চেয়েও ভয়াবহ। সন্তানদের সৎমা‘র সামনে না দিয়ে বাঘের সামনে দেয়াই ভালো, যন্ত্রণা একবারেই শেষ হয়। সন্তানদের মঙ্গল চাইলে কোন রক্তের সম্পর্কীত আত্মীয়ের বা নানা-নানী, খালাদের কাছে দেয়াই উত্তম সন্তানেরা সেখানে অন্তত জীবনের নিরাপত্তা পাবে। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে সন্তানদের হেফাজতে রেখে, নিরাপত্তা বিধান করে অন্যত্র চলে যাওয়াই শ্রেয়। পৃথিবীর কোন মা চায়না তার সন্তান সৎমা তথা সতীনের কাছে প্রতিপালিত হউক। সৎমায়ের সামনে আদরের সন্তান দিয়ে বাবা কখনোই নিস্তার থাকতে পারেনা। অভিযোগ আর অভিযোগ, তোমার সন্তান খারাপ, ইতর, অসভ্য ইত্যাদি। সৎমায়ের নৃশংসতা থেকে কোন কালেই কোন সৎসন্তান রেহাই পায়নি। কখনও কখনও সন্তানের জীবন নাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমন উদাহরণ ভূরিভূরি রয়েছে এ সমাজে। সৎমায়ের ছায়া যেন শিশুর গায়ে না লাগে। সন্তানদের সামনে সৎমা না দেয়ার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে।

সৎমা নয় ডাইনী
--- কবি সৈয়দ হোসেন
Ajkersokal24.com
সৎমা নয় ডাইনী — কবি সৈয়দ হোসেন Ajkersokal24.com


যে মহিলাটিকে বিয়ে করে আনা হলো তাকে কোন সন্তানই মা হিসাবে মেনে নিতে পারে না। এ মহিলাটিও মন থেকে সৎসন্তানদের নিজের সন্তানের মত মেনে নিতে পারেনা। এ সৎমা‘র আড়ালে থাকে সুবিধা গ্রহণের অভিপ্রায়, তার আগামী দিনের ভবিষ্যৎ অপরদিকে সন্তানরা চায় অনুকম্পা, মায়ের মত স্নেহ ভালোবাসা, এ চাওয়াটাই জীবনের জন্য হয়ে উঠে অভিশাপ। সামাজিক খাতিরে স্বামীর চাপে সৎমা‘র মুখে আদর যত্নের মৌখিক উষ্মা ঘটেমাত্র। এখানে লোভই কাজ করে অধিক লোভের সমাজে সৎসন্তান কাম্য নয়। সৎসন্তান পথের কাটা এটাই অনুমেয়। তাছাড়া সৎমার সামান্য শাসন সৎসন্তানদের মনের কোণে অনেক বড় আঘাত হয়ে দেখা দেয়। সামান্য কিছু ব্যতীক্রর্মী উদাহরণ ছাড়া যুগেযুগে সৎমা ডাইনী হয়েই আর্ভিভূত হয়েছে। এ সৎমা হাজার ভাগের একভাগও মায়ের দাবী পূরণ করতে পারেনা। সৎমায়ের আর্ভিভাব ঘটিয়ে মূলত: মাকে অপমান করা হয়। পৃথিবীতে মা শব্দটি অতিমধুর আবেগঘন, পবিত্র আত্মার নির্যাষ এবং সম্মানীত, এ শব্দটি পৃথিবীর সকল শব্দের সেরা। যে শব্দটির ব্যত্যয়ে জীবন উৎসর্গ করতে সন্তান এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে না। জীবনের চাইতেও অধিক মূল্যবান মা। মা শব্দের আবেগ অন্য কোন শব্দে নেই।
সৎমা শব্দটি যেমন সমাজে চলমান রয়েছে তেমনি ডাইনী শব্দটিও বহমান। মা বিয়ে করলে ভদ্রলোকটি হয় মামা কিংবা আংকেল। বাবা বিয়ে করলে মহিলাটির সাথে একটা উপাধি জুড়ে দিয়ে সৎমা হয়ে যায়। উজানো মাছ উজানে যায়, বিষ হলো বিষের বিষ। মাকে বিতর্কিত করে মা শব্দটির সম্মান জলাঞ্জলি দেয়া মোটেও সমীচীন নয় যদিও সৎমা স্বীকৃত। হে বিজ্ঞগণ, আমার জোর দাবী সৎমা সব্দটিকে রাক্ষসী কিংবা ডাইনী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা হউক, সংস্কার করা হউক নতুন ভাবে। শিশুরা যেমন রাক্ষস-খোক্ষস-ডাইনী থেকে ভয় পায়, মা-হারা সন্তানেরা সৎমাকে তেমন করে ভয় পাক এবং দূরে সরে থাক, কষ্ট হলেও হেফাজতে থাক. সুন্দর ও সুস্থ থাক। আর কোন সন্তান যেন সৎমায়ের হিংসার কারণ না হয়, মনটা ভেঙ্গে দিয়ে অকালে ঝড়ে না যায়।
মানুষ একই আত্মীয়কে ঠাম্মী বা নানী বলে থাকে, কেহ একটা বুঝে অন্যটা বুঝে না কিন্তু যারযার পরিবেশে তারা ঠিকঠাক বুঝে নেয় এবং আবেশিত হয়, এটা অভ্যাসের কারণ, প্রচলনের কারণ। আজ হতে যদি সৎমাকে ডাইনী-রাক্ষসীর মত উপস্থাপন করা হয় তবে, সৎসন্তানেরা ভয় পাবে এবং সহসা দূরে সরে যাবে। ঠাম্মী বা নানীরূপে যেমন আবেশিত হবে তেমন সৎমা সম্পর্কে ভীত এবং আতঙ্কিত হবে। শিশুরা সৎমা নামে ভয় পাবে। এ বিশ্ব হতে অনেক আচার-অনুষ্ঠান, জাতি-ধর্ম, সভ্যতার বিলুপ্তি ঘটেছে, পরিবর্তন হয়েছে সমাজ ব্যবস্থার। এ একটি পারস্পারিক সম্পর্কিত শব্দের উপস্থাপন পরিবর্তন করা হলে মানব সমাজের কোন ক্ষতি হবেনা বরং মা-হারা সন্তানেরা একটা নির্ভরতার সন্ধান খুঁজে পাবে। সৎমা শব্দটিকে অনেক আগেই ভয়ঙ্কর অর্থে বিশেষায়িত করা প্রয়োজন ছিলো।
নারীকে ঘৃণা বা অসম্মান করার জন্য আমার এ লেখা নয়। এ কথাটিতে হয়তো নারীবাদী বা উপনারীবাদী বন্ধুগণ খুঁজে পেতে পারেন নারী আপমানের গন্ধ, নারীকে ঘৃণা করার রসদ। আমি আশা করবো সার্বিকভাবে বুঝে নিবেন। সৎমার বিকল্প ডাইনী-রাক্ষসীর রূপ-রস-গন্ধ মিলিয়ে মা-হারা সন্তানদের সামনে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। এটিই হতে হবে এমনটি নয়, অন্য কোন নামেও হতে পারে। মোদ্দা কথা আমি চাই, মা-হারা সন্তানেরা সৎমাকে কল্পিত ডাইনীর মত ভয় পাক, আমি চাই সংস্কার, আমি চাই সৎমা শব্দটির বিশেষায়িত অর্থ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হউক, আমি চাই মা শব্দের যথাযথ সম্মান সংরক্ষিত হউক।
© মুন্সিগঞ্জ (১৫/১২/২০১৯)
বি:দ্র: আপনাদের মূল্যবান মতামত, সংস্কার আশা করছি। এ লেখাটিই চূড়ান্ত নয়, আপনাদের মতামতের ভিত্তিতে লেখাটি সংস্কার করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *